ঘরোয়া নাকি প্রফেশনাল হেয়ার রিমুভাল কোনটা আপনার জন্য সঠিক ?
নারীদের সৌন্দর্যের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় মুখের অনাকাঙ্ক্ষিত লোম বা ফেসিয়াল হেয়ার। এটি কেবল বাহ্যিক সমস্যা নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে থাকে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের নানা দিক। অনেকের ক্ষেত্রে এটা হালকা পাতলা হয়, আবার অনেকের বেশ ঘন আর কালো হয়। এটা নিয়ে অনেকেই হীনম্মন্যতায় ভোগেন।
ফেসিয়াল হেয়ার কেন হয় ?
শরীরে অতিরিক্ত লোম হওয়ার প্রধান কারণ হলো হরমোনাল ইমব্যালেন্স-
- PCOS: এটি নারীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এর ফলে শরীরে এন্ড্রোজেনের মাত্রা বেড়ে যায়।
- হরমোনাল ইমব্যালেন্স: শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন বেড়ে গেলে অর্থাৎ হরমোনের ব্যালেন্স নষ্ট হলে আনওয়ান্টেড হেয়ার বা অতিরিক্ত লোমের সমস্যা দেখা দেয়।
- জেনেটিক: পরিবারের অন্যদের এই সমস্যা থাকলে আপনার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে
- ওষুধের সাইড ইফেক্ট: অনেক সময় আমরা বিভিন্ন কারণে স্টেরয়েড বা হরমোন জাতীয় ওষুধ খেয়ে থাকি। এই ধরনের নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের রিঅ্যাকশন থেকেও শরীরে অতিরিক্ত লোম হতে পারে।
- মেনোপজ: বয়সের সাথে সাথে ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ায় লোম স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ঘরোয়া উপায়ে ফেসিয়াল হেয়ার কমানোর টিপস
- চিনি, লেবু ও মধুর স্ক্রাব: এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি। এটি অনেকটা পার্লারের ওয়্যাক্সিংয়ের মতো কাজ করে। চিনি, লেবুর রস, মধু এবং সামান্য পানি মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করুতে হবে। এটি পেস্টটি স্ক্রাব হিসেবে ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে পশম পাতলা হয়ে আসবে।
- বেসন ও হলুদের প্যাক: ২ টেবিল চামচ বেসনের সাথে আধা চামচ হলুদের গুঁড়া এবং সামান্য দুধ বা পানি মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করতে হবে। এটি নিয়মিত ব্যবহারে লোমের গ্রোথ ধীরে ধীরে কমে যাবে এবং স্কিন গ্লোয়িং হবে।
- পেঁপে ও হলুদের প্যাক: পেঁপেতে থাকা প্যাপাইন এনজাইম লোমের ফলিকল ভাঙতে সাহায্য করে। কাঁচা পেঁপে পেস্ট করে তাতে সামান্য হলুদ মিশিয়ে নিলেই হবে। এটি নিয়মিত ব্যাবহার করলে লোম অনেকটাই কমে যাবে।
- ওটস ও কলার স্ক্রাব: যাদের স্কিন সেনসিটিভ, তাদের জন্য এই স্ক্রাবটি বেশ ভালো। পাকা কলার সাথে ২ চামচ ওটস মিশিয়ে স্ক্রাবটি তৈরি হ্যে যাবে। সার্কুলার মোশনে ম্যাসাজ করতে হবে। এতে লোম পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি স্কিন হাইড্রেটেড থাকে।
প্রফেশনাল উপায়ে ফেসিয়াল হেয়ার কমানোর টিপস
দ্রুত এবং লং-টার্ম ইমপ্যাক্টের জন্য কিছু আধুনিক পদ্ধতি রয়েছে:
- থ্রেডিং ও ওয়াক্সিং: এটি ট্র্যাডিশনাল কিন্তু ইফেক্টিভ মেথড। বিশেষ করে যারা আইব্রো বা আপার লিপের পারফ্যাক্ট শেপ চান, তাদের জন্য থ্রেডিং এখনো টপ চয়েস। তবে ফুল ফেসের জন্য বর্তমানে হাইড্রো-ওয়্যাক্সিং বা বীন ওয়্যাক্স বেশি ভালো, কারণ এগুলো স্কিনের সেনসিটিভ লেয়ারকে ড্যামেজ না করে সরাসরি হেয়ার ফলিকলকে টার্গেট করে। এটি সাধারণত ৩-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত স্কিনকে স্মুথ রাখে। তবে সেনসিটিভ স্কিন হলে আফটার কেয়ার হিসেবে সুদিং জেল ব্যবহার করা মাস্ট।
- ফেসিয়াল রেজার বা ডার্মাপ্ল্যানিং: এটি কেবল আনওয়ান্টেড হেয়ার রিমুভ করে না, বরং স্কিনের উপরের ডেড স্কিন সেলস এক্সফোলিয়েট করে ইনস্ট্যান্ট গ্লো নিয়ে আসে। এটি পেইনলেস এবং কুইক সলিউশন। যারা মেকআপে ফ্ললেস ফিনিশ চান, তাদের জন্য এটি বেস্ট অপশন। তবে সঠিক অ্যাঙ্গেলে এবং হাইজেনিক রেজার ব্যবহার না করলে স্কিন ইরিটেশনের রিস্ক থাকে।
- লেজার হেয়ার রিমুভাল: লেজার ট্রিটমেন্ট হচ্ছে পার্মানেন্ট এবং লং-টার্ম সলিউশন। এটি হাই-টেক লাইট এনার্জি ব্যবহার করে চুলের গোড়া বা ফলিকলকে পার্মানেন্টলি ডরম্যান্ট করে দেয়, ফলে নতুন করে লোম গজানোর হার প্রায় ৯০% কমে যায়। বর্তমানে ডায়োড লেজার প্রযুক্তি এখন সব ধরণের স্কিন টোনের জন্য ভালো। বিশেষ করে ডার্ক স্কিন টেক্সচারের জন্য ভালো।
- লাইফস্টাইল মডিফিকেশন: ফেসিয়াল হেয়ারের মূল কারণ যদি হরমোনাল হয়, তবে ভেতর থেকে সুস্থ থাকা প্রয়োজন। আপনার দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নিচের পরিবর্তনগুলো আনলে ফলাফল হবে আরও কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী-
- মেটাবলিক ব্যালেন্স: শরীরের বাড়তি ওজন কমালে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমে যায়। এটি হরমোন ব্যালেন্স এবং অতিরিক্ত লোম গজানোর প্রবণতা কমাতে প্রাকৃতিকভাবে সাহায্য করে।
- অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট: রিফাইনড চিনি, অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট এবং প্রসেসড জাঙ্ক ফুড না খাওয়া। ডায়েটে পুষ্টিকর খাবার এবং ফাইবার যুক্ত করলে তা শরীরের এন্ডোক্রাইন সিস্টেমকে ভালো রাখে।
- স্পিয়ারমিন্ট টি: ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত দিনে দুবার পুদিনা চা বা স্পিয়ারমিন্ট টি পান করলে রক্তে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে আসে। এটি ঘরোয়াভাবে হরমোনাল হেয়ার গ্রোথ নিয়ন্ত্রণের একটি অত্যন্ত কার্যকরী এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
ফেসিয়াল হেয়ার মোটেও কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি আমাদের শরীরের হরমোনাল পরিবর্তনের একটি সিগন্যাল। আপনার যদি মনে হয় লোম খুব বেশি বা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, তবে ঘরোয়া পদ্ধতি পাশাপাশি অবশ্যই একজন Dermatologist বা Endocrinologist এর সাথে কথা বলুন।মনে রাখবেন, সুন্দর হওয়ার মানে এই নয় যে আপনার স্কিন একদম লোমহীন বা গ্লাসের মতো হতে হবে। আসল সৌন্দর্য আপনার সুস্থতায় এবং আপনার কনফিডেন্সে। আপনি যদি লেজার ট্রিটমেন্ট বা শেভিং যেটাই করেন না কেন, নিশ্চিত করুন সেটা আপনার স্কিনের জন্য ভালো হয়। সবশেষে, সঠিক ডায়েট, পর্যাপ্ত ঘুম আর স্ট্রেস ফ্রি জীবনই পারে আপনার হরমোনকে ব্যালেন্সে রাখতে এবং আপনাকে ভেতর থেকে গ্লোয়িং করতে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনার যেকোনো ধরনের সমস্যায়,আমাদের কনসাল্টেশন ফর্ম বা Skin Analyzer এর মাধ্যমে আপনার স্কিন টাইপ অনুযায়ী সঠিক প্রোডাক্টটি নিতে পারেন।